স্পেন এর গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬)

বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়টি সংঘাত একটি বৃহৎ মহাসংঘাতের পূর্বাভাস হিসেবে সংগঠিত হয়েছে  তার মধ্যে স্পেনের গৃহযুদ্ধ অন্যতম। এই যুদ্ধে একই সাথে স্পেনের  অভ্যন্তরীণ দীর্ঘমেয়াদী  রাজনৈতিক  সংঘাত ও আন্তর্জাতিক একাধিক গোষ্ঠীর এই  সংঘর্ষে জড়ানোয় এই যুদ্ধটিকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।যা বিশ্ব ইতিহাসে স্পেনের গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত।

                                       ছবিঃ যুদ্ধরত কমিউনিস্টপন্থি রিপাবলিকান বাহিনী      Image source: wikimedia
ঠিক কি কারণে স্পেনের গৃহযুদ্ধ এত বড় সংঘাতে রূপ নেয় এবং কিভাবে  তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানি  এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তা জানতে হলে আজকের এই তথ্যসমৃদ্ধ ও নিরপেক্ষ  প্রতিবেদনটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

প্রধান আলোচ্য বিষয় সমূহ

শতবর্ষ পুরনো শাসনতান্ত্রিক জটিলতা

স্পেনের গৃহযুদ্ধ ঠিক একদিনে হয়নি বরং তা শতবর্ষীয় রাজনৈতিক জটিলতার একটি চূড়ান্ত ফলাফল।স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হলে শতবর্ষ পুরনো সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা দরকার। ১৮০৮ সালে নেপোলিয়ন স্পেনে হামলা করেন তৎকালীন বোরবোঁ রাজতন্ত্রের ভেতরে বিদ্যমান অন্তর কোন্দলের সুযোগ নিয়ে এবং স্পেন দখল করেন। এরপর নেপোলিয়নের ভাই জোসেফ বোনাপার্ট তৎকালীন সময়ে স্পেনের শাসনভাগ গ্রহণ করেন।
  ছবিঃ যুদ্ধরত নেপলিয় বাহিনীর প্রতীকী ছবি
  Image source: wikimedia
তবে স্প্যানিশরা কখনোই জোসেফকে তাদের শাসক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জোসেফ ১৮১২ সালে সমাজ সংস্কারের নাম করে একটি প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন করেন তবে ১৮১৪ সালে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় এবং ফ্রান্সে পালিয়ে যান। অবশেষে ১৮১৪ সালে বোরবোঁ রাজ পরিবার আবারো ক্ষমতায় বসে। তবে জোসেফের প্রণীত সেই তথাকথিত প্রগতিশীল সংবিধানই পরবর্তীতে স্পেনের গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করে।

ক্ষমতাসীন বোরবোঁ রাজতন্ত্রের দুর্বলতা

নেপোলিয়নিক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন বোরবোঁ রাজতন্ত্র পুনরায় ক্ষমতায় বসে ততদিনে আস্তে আস্তে স্পেন তার উপনিবেশিক অঞ্চলগুলো হারাতে শুরু করে এবং ১৮২৫ সালের ভেতরে ল্যাটিন আমেরিকার সকল গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশগুলো তাদের হাতছাড়া হয়।  
 ছবিঃ ১৮০০ তে দক্ষিন আমেরিকায় স্প্যানিশ কলোনি
 Image source: wikimedia
এরই মধ্যে স্পেনে ক্ষমতালোভী একটি মহল গণতন্ত্র ও পুনরায় প্রগতিশীল সংবিধান বাস্তবায়নের নামে নারী উত্তরাধিকার,  প্রগতিশীলতা,মুক্তচিন্তার খোলসে মূলত তারা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় কুক্ষিগত করতে চেষ্টা করে এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ পৃথক করে দিতে চায় যা সে সময়ে সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তবে রাজ পরিবার সংশ্লিষ্ট ধনীদের লাগামহীন স্বেচ্ছাচারীতার কারণে তাদের সাধারণ জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ায় সরাসরি বাধাও দেয়নি।  
১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে স্পেন ফিলিপিনস হারায় এবং রাজতন্ত্রের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। পরপর এত বড় পরাজয়ের কারণে স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর ভেতরও ব্যাপক পরিমাণে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং শুধু মাত্র মরক্কোতে তাদের একমাত্র উপনিবেশ টিকে ছিল।

আরো পড়ুনঃ নেপলিয় যুদ্ধ

সামাজিক বৈষম্য ও উগ্র বামপন্থীদের উত্থান

স্পেনে এরই মধ্যে  ক্ষমতালোভী একটি মহল গণতন্ত্র ও পুনরায় প্রগতিশীল সংবিধান বাস্তবায়নের নামে নারী উত্তরাধিকার,  প্রগতিশীলতা,মুক্তচিন্তার খোলসে মূলত তারা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় কুক্ষিগত করতে চেষ্টা করে এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ পৃথক করে দিতে চায় যা সে সময়ে সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।
    ছবিঃ রাজা আলফোসো
    Image source: wikimedia
তবে রাজ পরিবার সংশ্লিষ্ট ধনীদের লাগামহীনতা ও স্বেচ্ছাচারীতার কারণে তাদের সাধারণ জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ায় জনগণ সরাসরি বাধাও দেয়নি। 

সামরিক বাহিনীর ভেতরে বিদ্যমান অস্থিরতা

পনেরশো থেকে ষোড়শ শতাব্দীর ভেতর বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল স্প্যানিশ সামরিক বাহিনী।বর্তমানে আমরা যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না বলে শুনি ব্রিটিশদের অনেক আগেই স্প্যানিশদের সাম্রাজ্যও ঠিক ততটাই বড় ছিল। ছিল সুবিশাল নৌবাহিনী।

   ছবিঃ স্প্যানিশ গ্যালিয়ন যুদ্ধ জাহাজ
  Image source: wikimedia
তবে জৌলুশভরা সেই সাম্রাজয় থেকে আস্তে আস্তে সকল ঔপনিবেশিক অঞ্চল হাত ছাড়া হতে হতে কেবল মরক্কোই তাদের হাতে ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই স্প্যানিশ সেনাবাহিনী এসময় ব্যাপক অস্থির সময় পার করে। আবার একই সাথে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও তাদেরকে চরমভাবে হতাশ করে।      

১৯৩১ এ কমিউনিস্ট রিপাবলিকান সরকারের ক্ষমতায়ন

স্প্যানিশ রাজপরিবারের ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্বেও যেহেতু রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট ধনী বয়বসায়ী ও এলিট-শ্রেণীর লাগামহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তাই জনতার রোষানলে পড়ে অবশেষে ১৯৩১ এ তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। রাজপরিবার সংশ্লিষ্টরা যদিও নির্বাচনে দাড়ায় তথাপি তাদের সেচ্ছাচারিতার কারনে জনতার সমর্থন হারায় ফল স্বরূপ দীর্ঘদিন হতে ক্ষমতার স্বাদ পেতে মুখিয়ে থাকা রিপাবলিকান পার্টি অবশেষে ক্ষমতায় আসীন হয়।

স্পেন এর সেসময়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় বসা ছিল তাদের ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা। দীর্ঘ দিনের সফল রাজতন্ত্রীয় শাষনে ক্রমেই অযোগ্য শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় থাকা ও তাদের ব্যর্থ্যতাই এই রিপাবলিকান পার্টিকে ক্ষমতার স্বাদ পাইয়ে দেয়। একটি ভুল তথ্য প্রায়ই ছড়িয়ে থাকা হয় যে স্প্যানিশরা রাজতন্ত্র পছন্দ করত না, বাস্তবতা ছিল রাজপরিবার সংশ্লিষ্টদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অযোগ্য রাজার শাসনভার পালনে অক্ষমতা জনতাকে নতুন শাসকগোষ্ঠীকে একপ্রকার স্বাগত জানাতে বাধ্য করে।

তবে ক্ষমতা পেয়েই জনগনের সামনে বামপন্থী  রিপাবলিকানদের আসল চেহারা প্রকাশ পায়। ক্ষমতার আসনে বসতেই তারা জোসেফ বোনাপার্টের দেখানো পথে প্রগতিশীল সংবিধান প্রনয়ন করতে শুরু করেন। ক্ষমতায় এসেই ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি ঘোষনা করে, সকল চার্চের জমি অবৈধভাবে দখল করে রাতারাতি,শিক্ষা থেকে চার্চকে ভিন্ন করে ফেলে ও ধর্মীয় সকল প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

 সামরিক বাহিনীতে দেশপ্রেমিক সামরিক কমান্ডারদের সরিয়ে বসায় তাদের পছন্দসই লোকদেরকে।যেখানে তাদেরকে জনগণ ভোট দিয়েছিল দেশের স্থিতিশীলতা আনতে,অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়তে ও সামরিক জোলুস ফিরিয়ে আনতে সেখানে তারা পূর্ববর্তী সরকারের মস সেচছাচারীতা তো করে সাথে ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর রীতিমতো নিপিড়ন শুরু করে। এতে জনতা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়। ফলস্বরূপ ১৯৩৩ এই তাদের বিদায় নিতে হয়।

ডানপন্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয়

১৯৩৩ সালের নির্বাচনে জনগন পুনরায় জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে।এসময় নতুন সরকার রিপাবলিকানদের দমন-পীড়ন চালানো আইনগুলো বাতিল করে ও সত্যিকারের রাষ্ট্র সংস্কারে মনোযোগ দেয়। তবে সদ্য পরাজিত রিপাবলিকানরা তাদের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে দেশব্যাপী নাশকতা শুরু করে। 
  ছবিঃ বিজয়ী শাসক আলেহানদ্রো
   Image source: s.n.leksikon
সরকার প্রথমদিকে এদের সফলতার সাথে দমন করতে পারলেও সমস্যা বাধে তাদের আগের মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময় নিয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা। তারা রিপাবলিকানদের সাথে আতাত করে বসে আবার এর সাথে যোগ হয় অর্থনৈতিক মন্দা ও সেনাবাহিনীর অসন্তোষ কারন সেনাবাহিনী ক্রমবর্ধমান সংঘাত ভালো চোখে দেখছিলনা, ফলে ১৯৩৬ সালে পতন হয় সংস্কার করতে চাওয়া ডানপন্থীদের।

১৯৩৬ এ বামপন্থীদের বিজয় ও গৃহযুদ্ধের সূচনা

১৯৩৬ এ ২য় বারের মত ক্ষমতা হাতে পেতেই রিপাবলিকানরা এবার ডানপন্থী ও ধর্মপ্রান নিরিহ খ্রিস্টানদের ওপর চরম নিপীড়ন চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি এত খারাপ হয়ে ওঠে যে পূর্ববর্তী সরকারের লোকজনদেরও গ্রেফতার করা হয় এবং কারাগারে প্রেরন করা হয়। পুরো স্পেনই যেন হয়ে ওঠে এক বন্দীশালা। এবং পুনরায় শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানদের ওপর আইন প্রনয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মদদে নিপিড়ন শুরু করে।
তাদের এই সিধান্তই তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কফিনে শেষ পেরেকটিও ঠুকে দেয়। কারন জনগন যখন সরকারের সাথে থাকে না সে সরকার কোনোদিনও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারে না। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি।এতেই শুরু হয় স্পেন এর সেই ঐতিহাসিক গৃহযুদ্ধ যা পরবর্তী সময়ের স্পেনকে নতুন পথের দিকে ধাবিত করে।

দৃশ্যপটে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর অবতারণা

নৌবাহিনীর কর্মকর্তা বাবার সন্তান ফান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো ছোটবেলায় হতে চেয়েছিলেন একজন গর্বিত নৌসেনা। পূর্বেই বলা হয়েছে যে স্পেন এর নৌবাহিনী একসময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নৌবাহিনী ছিল ফলে তাদের দেশের মানুষ নৌ সেনাদের আলাদা চোখে দেখতেন। তবে ফ্রাঙ্কো সেনা ক্যাডেট স্কুলে ভর্তি হলে পরবর্তীতে একজন সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। 
জেনারেল ফ্রাঙ্কো ছিলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে চৌকশ সেনা কর্মকর্তাদের একজন। ১৯২০ সালে মরক্কোতে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন শুরু হলেও ফ্রাঙ্কো তার চৌকস বুদ্ধিতে সেই আনদোলন কঠোর হস্তে দমন করেন ও হাত থেকে প্রায় ছুটে যাওয়া শেষ উপনিবেশকে নিজেদের কব্জায় রাখেন। এতে একে তো সেনা সদস্যদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় হন আবার জনতাও তার এই সাহসিকতার কারনে তাকে বেশ পছন্দ করতে শুরু করে ও দ্রুত তিনি পদোন্নতি পান।
  ছবিঃ জেনারেল ফ্রাঙ্কো
Image source: picryl
আর ঠিক একারনেই ফ্রাঙ্কো ডানপন্থীদের প্রধান পছন্দ ছিলেন। তাছারা তার আরেকটি পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় রক্ষণশীল খ্রিস্টান। যা তাকে ডানপন্থীদের চোখের মণি হিসেবে গড়ে তোলে।ডানপন্থীরা তাকে বিদ্রোহে যোগ দিতে বললে প্রথমদিকে তিনি কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও পরে দেশ মাতৃকায় সার্বোভৌমত্ত রক্ষার টানে তিনি এই বিদ্রোহে যোগ দেন।

জার্মান বাহিনী স্পেন এ (কনডোর লেজিয়ন)

জার্মানিতে ১৯৩৩ সালে এডলফ হিটলার চ্যান্সেলর নিযুক্ত হলে ইউরোপে জার্মানরা ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাড়িয়ে চলতে শুরু করে। এডলফ হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পশ্চিম ফ্রন্ট এ জার্মানির হেরে যাওয়ার স্মৃতি কোনোদিনও মানতে পারেননি। তাই তিনি আবারও তার সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে চলতে শুরু করেন। এরই মধ্যে ফ্রাঙ্কো তার কাছে সহায়তা চেয়ে বসেন। যদিও জার্মানরা প্রথমে তাকে সন্দেহ করে তবে জার্মান ইনটেলিজেন্স ক্লিয়ারেন্স পেলে তার সহায়তায় জার্মানরা এগিয়ে আসে। 
ছবিঃ জার্মান অফিসার সেনাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন
 Image source: wikimedia
লত ফ্রাঙ্কো যেহেতু মরক্কোতে ব্যপক জনপ্রিয় ছিলেন তাই তার কট্টর সমর্থক সেনারাও বেশিরভাগ মরক্কোতেই ছিল। এখন বিদ্রোহে যোগ দিতে হলে তাকে স্পেন এ যেতে হলে তাদের কাছে এত পরিমান পরিবহন বিমান ও জাহাজ ছিল না যা তাদের দ্রুত স্পেন এ পৌছাতে পারে। এমতাবস্থায় জার্মানি তাদের জেইউ-৫২ বিমানে করে সেনা পরিবহন ও জাহাজের মাধ্যমে অস্ত্র পরিবহন করে স্পেন এ পৌছে দেয়। 

          ছবিঃ ফাইটার বম্বার জেইউ-৮৭ স্টুকা
Image source: wikimedia
স্পেন এর যুদ্ধ জার্মানির জন্য শুধু একটি কৌশলগত পদক্ষেপ নয় বরং তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে নিজেদের সমরাস্ত্র ও সামরিক কলাকৌশল ঝালিয়ে নেবার এক উত্তম সুযোগ। জার্মানরা তাদের একটি বিশেষায়িত সামরিক ইউনিট পাঠায় স্পেন এর গৃহযুদ্ধে যারা কনডোর লেজিয়ন নামে পরিচিত ছিল। এটি জার্মান ওয়েরমাকট,লুফটওয়াফে এবং ক্রিগসমেরিন এর সমন্বয়ে গঠিত একটি ইউনিট।
ছবিঃ জেইউ-৫২ সামরিক পরিবহন বিমান
 Image source: wikimedia   
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৩৭ সালে জার্মানরা গুয়েরনিকাতে ধ্বংশাত্বক বোমা হামলা চালায় যা জার্মানীর পরবর্তী সামরিক ইতিহাসের কৌশলই বদলে দেয়। কারন এ হামলায় জার্মানরা প্রথম বারের মত তাদের জেইউ-৮৭ ফাইটার বম্বার ও ব্লিৎজক্রিগ সামরিক কৌশল ব্যবহার করে এবং সফল হয় যা জার্মান সেনাদের এক অনন্য উচ্চতায় পৌছিয়েছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধে।ঠিক এজন্যই স্পেন এর গৃহযুদ্ধ এতোটা আলোচিত।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া

জার্মানির মত তৎকালিন পরাশক্তির অংশগ্রহণে ভয় পেয়ে কমিউনিস্টপন্থী রিপাবলিকানরা সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক সাহায্য চেয়ে বসে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আধিপত্য বিস্তার এর সুযোগ দেখতে পেয়ে সেসময় সমরাস্ত্র পাঠায় তবে সরাসরি সেনা পাঠানোর কোনো সুযোগ ছিল না তাই সেনা অফিসার পাঠায় যুদ্ধে দিক নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করতে। এটি ছিল বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মান আর সোভিয়েতের প্রথম ফেস অফ। তবে আধুনিক জার্মান বাহিনীর সামনে তুরুপের তাশের মত তাদের বাহিনী আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ে।
     ছবিঃ রিপাবলিকানদের সোভিয়েত বিটি-৫ ট্যাংক
Image source: wikimedia

ডানপন্থীদের চূড়ান্ত বিজয় ও  ফ্রাঙ্কোর শাসন আমল

১৯৩৬ এ শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রথমে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও রিপাবলিকানদের সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা আস্তে আস্তে ১৯৩৯ আসতে আসতে হেরে যায়। সোভিয়েত সেনা সহায়তা না পেলে আরও আগেই পরাজিত হতো বাম ঘরানার এই কমিউনিস্টপন্থীরা। সর্বশেষ এব্রো নদীর পাড়ে তাদের শেষ প্রতিরোধ গড়ে তুলে ১৯৩৮ এ তবে বাজেভাবে হেরে যায়। অতঃপর পিছু হটতে হটতে শেষে আত্মসমর্পণ করে ১৯৩৯ সালে।  
এই যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাধারণ আমজনতার সমর্থন কখনোই পায়নি কমিউনিস্টপন্থী রিপাবলিকানরা। এর মূল কারন চার্চ ও পাদ্রিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন। ধর্মকে একেবারে আালাদা করে ফেলা,দমন-পীড়ন চালানো,সংস্কারের নামে জনতার সামনে মুলা ঝুলানো হয়। তাই শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসকের মতই বিদায় নিতে হয় রিপাবলিকান সরকারের। 
   ছবিঃ স্পেনের এব্রোতে যুদ্ধরত স্প্যানিশ সেনারা 
image source: wikimedia
যদিও ফ্রাঙ্কোকে ১৯৩৬ এ তাকে জাতীয়তাবাদী নেতা নিযুক্ত করে ডানপন্থীরা এবং সাধারন জগনের সমর্থন পান তবে ১৯৩৯ এ পূর্ণ বিজয়ের পর তিনি পুরো স্পেন এর শাসনভার গ্রহন করেন এবং মৃত্যুর আগে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সফলতার সাথে স্পেন শাসন করেন। যা আধুনিক স্পেন এর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং একই সাথে সফলতম।  

২য় বিশ্বযুদ্ধে স্পেন এর ভূমিকা

২য় বিশ্বযুদ্ধে স্পেন কখনোই সরাসরি জড়ায়নি তবে জার্মানির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে তাদের একটি সেচ্ছাসেবক যোদ্ধা বাহিনী পাঠায়। এরা ব্লু ডিভিশন নামে পরিচিত ছিল। তবে অপারেশন বারবারোসা চলার শেষ সময়ে জার্মানি যখন রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনীকে আর মোকাবেলা করতে পারছিলনা ও পরাজিত হতে থাকে তখন স্পেন তাদের এই ডিভিশনকে স্পেন এ ফেরত নিয়ে আসে। তাদের উপর মিত্র শক্তির চাপ ছিল এমনি তাদের ওপর হামলার হুমকি দেয় মিত্রশক্তি।
 ছবিঃ সোভিয়েত ইউনিয়নে যুদ্ধরত স্প্যানিশ সৈন্যরা
Image source: wikimedia

বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্পেন (গৃহযুদ্ধের ফলাফল)

স্পেন এর দীর্ঘ মেয়াদী রাজনৈতিক সংকট,জনগণের ভুক্তভোগী হওয়া ও ১৯৩৬ এর রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের পর স্প্যানিশরা বুঝতে পারে তাদের অনৈক্য তাদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। আবার ফ্রাঙ্কোও ক্ষমতায় আাসার পর শক্তভাবে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন এবং দুষ্কৃতকারীদের দমন করেন কঠোর হস্তে। এতে স্পেন এ শান্তি ফিরে আসে। 
 ছবিঃ স্পেন এর রাজধানী মাদ্রিদ
 Image source: wikimedia
সেই গৃহযুদ্ধ থেকে স্পেন শিক্ষা নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে একতাই শক্তি। আজ স্পেন বিশ্বের সেরা অর্থনীতিগুলোর একটা। তাদের আছে দক্ষ ও পেশাদার সামরিক বাহিনী। স্ট্যাবল একটি অর্থনীতি এমনকি ইইউতে প্রভাব। আজও বোরবোঁ রাজবংশ স্পেন এ আছে। এদের মধ্যে রাজকন্যা লিয়োনোর বেশ আলোচিত বিশ্বব্যাপী।



এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url